শিশু-কিশোরের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার যত্ন নিন | ডা আবিদা সুলতানা
বাংলাদেশে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়নে ২৩ এপ্রিল পালিত হয় শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিবস। এখনও অনেকে জানেই না যে শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়টি কী? এই দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য হলো অভিভাবক, শিক্ষক এবং নীতিনির্ধারকদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো, যাতে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চেনা যায়। বিশ্বব্যাপী প্রতি দশজন শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। ১৫-১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা, মৃত্যুর চতুর্থ সর্বোচ্চ কারণ। কোনো কোনো মা-বাবা ও অভিভাবক আক্ষেপ করেন, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানতে পারলে হয়তো আগেই সন্তানের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারতেন। তাই এ বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। মানসিক অসুস্থতা নিয়ে সবার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। মনে রাখতে হবে, মানসিক রোগ কোনো অপরাধ বা ব্যর্থতা নয়। শিশু ও বয়স্ক যে কারোরই মানসিক অসুখ হতে পারে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। এ রকম লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের ক্ষেত্রে নিচের লক্ষণগুলো দেখলে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, যাতে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করতে পারেন। শিশু যদি ঘন ঘন রেগে ওঠে অথবা বেশির ভাগ সময় ভীষণভাবে খিটখিটে হয়, প্রায়ই ভয় বা উদ্বেগের কথা বলে, কোনো কারণ ছাড়া বারবার পেটব্যথা বা মাথাব্যথা সম্পর্কে অভিযোগ করে, সব সময় অস্থির থাকে এবং চুপ করে বসে থাকতে না পারে, খুব বেশি কিংবা কম ঘুমায়, দুঃস্বপ্ন দেখে, অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলতে আগ্রহী না হয় অথবা বন্ধুত্ব করতে না পারে, পরীক্ষায় হঠাৎ খারাপ ফল করে ইত্যাদি। কিশোর-কিশোরীদের বেলায়, যদি তারা যে বিষয়গুলো উপভোগ করত সেগুলোয় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তাদের দুর্বল লাগে, খুব বেশি কিংবা কম ঘুমায় অথবা সারাদিন তন্দ্রাচ্ছন্ন বোধ করে, বেশির ভাগ সময় একা থাকে, বন্ধু-বান্ধব বা পরিবারের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলে, ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে থাকে অথবা খুব কম খায়, নিজেকে আঘাত করে; ধূমপান, মদ্যপান অথবা মাদক গ্রহণ করে; একা বা বন্ধুদের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ বা আক্রমণাত্মক আচরণে লিপ্ত হয়, আত্মহত্যার চিন্তা করে, ভাবে যে কেউ তাদের মনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে বা তারা এমন কিছু শোনে, যা অন্যরা শুনতে পায় না। উদ্বেগ এবং কষ্টের বিষয় হলো প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সাধারণ মানসিক সমস্যা ছাড়াও অল্পবয়সীরাও তাদের নির্দিষ্ট ব্যাধিতে ভোগে। এর মধ্যে রয়েছে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (অঝউ), অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার (অউঐউ), উন্নয়নমূলক বিলম্ব বা বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা এবং স্পেসিফিক লার্নিং ডিসঅর্ডার (ঝখউ), পাশাপাশি মানসিক বা আচরণগত ব্যাধি যেমন অপজিশনাল ডিফিসিয়েন্ট ডিসঅর্ডার (ঙউউ), কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার (সিডি), আচরণগত আসক্তি (ইন্টারনেট ব্যবহার, গেমিং ব্যাধি)। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীরা স্ট্রেস সম্পর্কিত অসুস্থতা, অবসেসিভ-বাধ্যতামূলক ব্যাধি (ওসিডি), বাইপোলার ডিসঅর্ডার, খাওয়ার ব্যাধি, সিজোফ্রেনিয়া এবং অন্যান্য মানসিক অবস্থাতেও ভুগতে পারে।
আচরণগত এবং মানসিক সমস্যা সম্পর্কিত উদ্বেগগুলো পারিবারিক ডাক্তার বা শিশু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে, তারা তখন শিশু বা কিশোরকে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর কাছে পাঠাতে পারেন। শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিবেচনায় রেখে প্রসব-পূর্ব (এএনসি) ও প্রসব-পরবর্তী সেবার (পিএনসি) ওপর জোর দেওয়া দরকার। পিএনসি সেবা ৪টি নিলে একজন মা বুঝতে পারেন, তার কতক্ষণ ঘুমানো দরকার, কতটা পুষ্টিকর খাবার দরকার। এজন্য পরিবারের সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ আসা কলের তথ্য তুলে ধরে সমাজসেবা অধিদপ্তর জানায় যে, ২০২৪ সালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চেয়ে শিশু-কিশোর-কিশোরীদের জন্য কল এসেছিল ৫ হাজার ৩৩০টি। এক বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে এ কলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৪০-এ। ইউনিসেফ বাংলাদেশ একটি গোলটেবিল বৈঠকে জানায় যে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মধ্যে প্রায় ১৩ জন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। তাই তারা মানসিক স্বাস্থ্য খাতে আরও বিনিয়োগ, নীতিগত গুরুত্ব এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও শিশু সুরক্ষা খাতের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান, যাতে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে। এছাড়া শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে পরিবারে অভিভাবকদের ও স্কুলে শিক্ষকদের বড় ভূমিকা রয়েছে। সামাজিক ও আবেগীয় শিক্ষার (সোশ্যাল অ্যান্ড ইমোশনাল লার্নিং) মাধ্যমে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, মানসিক চাপের সময় সিদ্ধান্ত নিতে পারা, সামাজিক সচেতনতা ও সংকট মোকাবিলায় দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তৈরি করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যান্য মাধ্যমেও ছড়িয়ে দিতে হবে। ¯ু‹ল, বাসা ও ডিজিটাল পরিসরও যেন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে। এজন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করা দরকার। শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যকে এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ ও সক্ষম হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।


No comments